ভার

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই মন কেমন করা শুরু হয়। আকাশে যত আঁধার ঘনিয়ে আসে, সেটা আরো বাড়তে থাকে। কোনোভাবেই এই অনুভূতিটা এড়াতে পারে না অতুল। কখনো কখনো ব্যতিক্রম ঘটে বৈকি। এই যেমন আজ; পুরো আকাশ ধীরে ধীরে ঝুলে পড়ছে নিচে। শুধু পশ্চিম দিকটায় ফাঁকি রয়ে গেছে। ওদিকটায় কাঁচা সোনা লেপ্টে আছে। সময়ের সাথে সেটা বাড়ছেই। সে রূপে চোখে ধাঁধা লাগে। সম্মোহিতের মতো সেদিকে চেয়ে থাকে সে। বুকের ভেতরটায় ছটফট করছে। হাঁসফাঁস করছে কেমন। তবু চোখ ফেরাতে ভয়। যেন হারিয়ে যাবার, মিটে যাবার ভয়। সে যতই মরতে যায়, ততোই জ্বলে ওঠে; ততোই রাঙা হয়। এরপর ধুপ করে একরাশ আঁধার ছিটিয়ে পালিয়ে যায়।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে উঠে পড়ে অতুল। জায়গা করে নিয়ে বাস কন্ডাকটরের মৃদু ধাক্কায় উঠে পড়ে ভীড় ঠেলে।
বাস থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরায় সে। রাত বাড়লেও চারদিকের কোলাহল কমেনি একদম। গাড়ির প্যাঁ পোঁ, ঝগড়া মারামারি, খিস্তি, চায়ের কাপের টুংটাং আর মাইকে যোগ্য পার্থীর ভজন পাল্লা দিয়ে চলছে। তাতে কিছুই যায় আসে না অতুলের। কিছুতেই কিছু যায় আসে না। ভারী ভারী দুটো পা টেনে চলে চারদেয়াল ওরফে বাড়ির দিকে। বড় ফ্ল্যাট, ফ্ল্যাটের বিশাল দরজা, সেই দরজার সামনে একমাসের গ্যাস বিলের চেয়েও দামী পাপোশ। তবে দরজায় পা রাখতেই ডান কোণে বেমানান বড় ফুলদানীটা চোখে লাগবে যে কারো। এ পরিবারের গুটিকয়েক পুরোনো বেঁচে যাওয়া জিনিসপাতির একটা। স্বচ্ছলতার বহু আগের সুখের ঘ্রাণটা লেগে আছে ওটায়। প্রথম টিউশনির টাকায় মা’কে চমকে দেবে বলে অতুল হুট করেই নিয়ে আসে একদিন। মা খুশি হয় কিনা বোঝা যায়নি৷ বড় চাপা স্বভাব তাঁর। তখন থেকে ফুটপাতে শুয়ে রাজভোগের বিলাসিতার মতো ফুলদানীটা সেই নিরস ঘরে বেমানান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো এক কোণে। দীপ্তি ছড়াতো নিরবে। আজও সে বেমানান। এত আলো, এত ঝকঝকে বিলাসিতার ছড়াছড়ি রঙ নিংড়ে নিয়েছে তার। আর বাদবাকি বেঁচে যাওয়া পুরোনোদের খবর জানেনা অতুল। না আঁচ লাগে পুরোনো মানুষগুলোর।
খসখসে লুঙ্গি পাঞ্জাবী পড়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো বাবা আর নিজেদের মধ্যে কানাকানি করে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা বোনদের খবর নেয়নি কতকাল। মা’র চোখের নিচের কালি বাড়ছে কেন, ভাইটাকে আগের চেয়েও রোগা আর ফ্যাকাসে লাগে কেন এর উত্তর পায় না নিয়ম করে।
মা একগাল হেসে বলে, কই? সবই তো ঠিক আছে বাবা।
মায়ের হয়তো মায়া হয়। তাই লুকোয়। অতুলও ঘাটায় না। মায়া ভালবাসা একপাশে রেখে নিয়ম করে শরীরটাকে বয়ে চলে। নিয়মের বাইরে যায় না বড় একটা।
আজও বৃষ্টি হবে হবে করছে। আঁধার করা মেঘের সাথে এলোমেলো বাতাস। বাসটা চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল। পা দু’টো গেড়ে গেছে যেন। উঠতে ইচ্ছে করেনি। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক বাইকার এসে ‘কই যাবেন’ জিজ্ঞেস করলো এসে। কিছু না ভেবেই পেছনে উঠে বসলো। কমবয়েসী বাইকার। সুযোগ পেলেই হু হু করে গতি বাড়াতে থাকে গাড়ির আর একই গতিতে মুখ চালিয়ে যায়। অতুল হুঁ - হাঁ করে যায়। পুরো প্রেক্ষাপটটা মিলে কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে ভেতরটা। মেঘটা, বাতাসটা এসে চেপে বসছে কেমন। যেন এখনই তাকে ছুঁয়ে পেরিয়ে যাবে, অথবা জাপটে ধরবে এসে। বুকের ভেতরটায় তার আবার সেই ছটফটানি ভাবটা ফিরে এসেছে। হাঁসফাঁস লাগছে। তার সাথে আরেকটা নতুন ব্যাপার যা হচ্ছে, পালিয়ে যাবার এক তীব্র ইচ্ছে ফুটে বের হচ্ছে। কার কাছ থেকে, কোথায় বা আর সব বাস্তবতা শুকনো পাতার মতো তীব্র হাওয়ায় উড়ে চলে যাচ্ছে। একেক ঝাঁক পাতার সাথে অতুলের বুকের ভার কমে যাচ্ছে একেক মণ করে। ইচ্ছে করছে পাতার মত করে নিজেকেও ছেড়ে দেয়। উড়ে চলে দিক - বিদিকহীন। কোথাও একটা গিয়ে পড়বে। আবার উড়ে যাবে; যেখানে যেখানে হাওয়ার মর্জি হয়।
বাইকটা ধীর হয়ে থেমে আসে। অতুল মাথা তুলে তাকায় অফিস দালানে তার জানালাটার দিকে। এখনো বন্ধ। ভ্যাপসা। চেপে বসা, গিলে নেওয়ার আশায় অপেক্ষা করে আছে। নিঃশব্দে।

Comments

Popular Posts