অ-দু’পেয়ে

আমি এমন এক প্রাণী যার না আছে ঠাঁই বনে, না আছে লোকালয়ে। অবশ্য জঙ্গলই বা এখন আছে কোথায়? যারা জঙ্গলে ছিল শুনেছি তারাও বেঘোরে মরছে। সে যাক, বল দেখি আমি কে?

এহহে! না, না, করলে তো ভুলটা। আরে বুঝলাম বিড়াল দেখতে ছোটখাট, নাকটাও বোঁচা, তোমার ভীষণ মায়া মায়া লাগে তাকে দেখলেই। তাই বলে এমন অন্ধ ভালবাসা থাকলে কি করে হবে? বিড়ালের জাত বাঘ যে জঙ্গলেই থাকে ভুলে গেছ? তা, বিড়ালগুলো যে কেন আমাদের পেটে লাথি মেরে শহরে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়, সে আমি কিভাবে বলব? তা, আমি কে, বুঝে গেছ তো? হ্যাঁ, ওই। কুকুর। তোমরা যাদের নাম তুলে নিজেদের ডাকতে ভালবাসো, আমি তেমন নই একদম। আমি ভীষণ নিরীহ৷ খুব দরকার না হলে তোমাদের, মানে দু’পেয়েদের ভড়কাই না। এখন যে মেয়েটার কোলে থাবা রেখে বসে আছি, তাকে আমার বড় ভাল লাগে। মাঝে মাঝে খাবার টাবার দেয়। তার মন ভাল থাকলেই কান মাথা চুলকে এমন আদর করে যে আরামে ঘুম এসে যায়। কানের কাছে গুটুর গুটুর কি যেন বলে যায় ওদের ভাষায়। বোধয় আমাকে দু’পেয়ের ভাষা শেখায়। তা শেখাক। সব বোঝার ভান করে আদরটুকু নিতে পারলেই হল। এমন দু’পেয়ে খুব একটা পাইনা। ওর সাথের মেয়েরা দয়া দয়া চোখে দেখে আমাকে। একটু আধটু আদর করে চলে যায়৷ ওরা সবাই-ই কি একটা বলে যেন ডাকে আমাকে। নামটা কেমন কেমন। ঠিক কুকুর কুকুর লাগে না। তবে শুনলে ঠিক বুঝতে পারি আমাকেই ডাকছে। যখনই ডাকে আমি আর ওদের শত্রুদের ভড়কাই না। তবে দাঁত খিঁচিয়ে মুখটাকে ভয়ঙ্কর করে রাখি। তাতেই খুব কাজ হয়। ওরা যতক্ষণ থাকে আমি ওদের শত্রুদের কাছে ঘেঁষতে দিইনা একদম। কিন্তু ঝামেলা হল সেই সে মেয়েটা, সে আসে বড় কম। বাকি দিনগুলো তার অপেক্ষা করে করে কাটাতে হয়। নাহ, ভুল বললাম। আমাদের অপেক্ষা করে কাটালে চলে না। কোথাও শুয়ে চোখ বুজলেই তোমাদের ঠ্যাঙাড়ে বাসনা চিড়বিড়িয়ে জেগে ওঠে। ফুটপাতে শুলে তাড়িয়ে দেবে। রাস্তায় গাড়ি চাপিয়ে দেবে। একটা বাচ্চাকে সেদিন শুকনো নালায় নেমে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দেখে থমকে গেছিলাম। ওর সুখী মুখটা দেখে মনে হল, বেশ তো! ওটাই বোধয় আমাদের জায়গা। নির্ঝঞ্ঝাট, ভয়ডরহীন। থাকবার অতো বড় বড় বাড়ি নেই আমাদের; বাড়ি তো দূর, একটা ছাউনি খুঁজে বেড়ানোই প্রতিদিনকার কাজ। সেখানে কোনোরকমে গায়ে গা ঘেঁষে মাথা গোঁজা। আঁধার কাটতেই খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হয়। কিছু নির্দিষ্ট জায়গা থাকে খাবারের। ওতে সবারই ভাগ থাকে। সবার মানে কাক বিড়াল আবার কত সময় তোমরা দুপেয়েরাই আমাদের খাবারে ভাগ বসাতে আসো৷ তখনও কাছে গেলে তাড়িয়ে দাও! তাই ওর আশায় থাকলে আর চলে না। অলিগলি সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়। খাবারের দোকানগুলো থেকে বাতাসে সুবাস আসে। যদিও ওসব একসময় অখাদ্য লাগতো, তবে এখন পেটের দায়ে খেয়ে নিই। সেখানে দেখি দুপেয়েগুলো খুব তো গিলে যাচ্ছে। দিনে রাতে যখনই যাই না কেন, তাদের আনাগোনায় কমতি নেই। তা সে খাও তোমরা। আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু কাছে গেলেই অমন দুর দুর করো না। সারাদিন গিলেও তোমাদের ক্ষুধা মেটে না। অথচ ভাবো আমাদের পেট আপনা আপনিই ভরে যাবে! আমাদের তো অমন দোকান নেই, কেউ খাবারও দেয়না। বেঁচে থাকবটা কি করে? জিভ আধখানা বেড়িয়ে পড়ে ক্ষিধেয়। তোমাদের ফেলে যাওয়া টুকরো টাকরা পাই–না পাই, ভুখা পেট নিয়ে অতো দৌড়ে পারিনা৷ বড় কষ্ট হয়। ওই দেখ! ছি ছি, কিছু মনে কোরো না যেন। আমার কিন্তু তোমাদের নিয়ে নালিশ করার ইচ্ছে ছিল না একদমই। ইচ্ছে ছিল আমার জীবনটা নিয়ে কিছু বলি।

Comments

Post a Comment

Popular Posts